শয়তানের জবানবন্দি: আরজ আলী ও আগন্তুকের যুক্তির মুখোমুখি

শয়তানের জবানবন্দি: আরজ আলী ও আগন্তুকের যুক্তির মুখোমুখি
শয়তানের জবানবন্দি: আরজ আলী ও আগন্তুকের যুক্তির মুখোমুখি

আরজ আলী মাতুব্বরের শয়তানের জবানবন্দি বাংলা যুক্তিবাদী সাহিত্যধারার এক অনন্য নিদর্শন। এটি কোনো সাধারণ ধর্মবিরোধী গ্রন্থ নয়, আবার নিছক দর্শনচর্চাও নয়। বরং এটি এমন এক বৌদ্ধিক মঞ্চ, যেখানে বিশ্বাস ও অবিশ্বাস, প্রশ্ন ও উত্তর, শাস্ত্র ও যুক্তি—সবকিছু মুখোমুখি দাঁড়িয়ে পড়ে। এই গ্রন্থের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো আরজ আলী ও “আগন্তুক”-এর কথোপকথন, যেখানে লেখক এক কাল্পনিক চরিত্রের মাধ্যমে সমাজের প্রচলিত ধর্মীয় ধারণাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেন।

আগন্তুক এখানে কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি নয়। সে মূলত প্রচলিত বিশ্বাস, ধর্মীয় শিক্ষা ও সামাজিক সংস্কারের প্রতিনিধি। অন্যদিকে আরজ আলী নিজে দাঁড়ান যুক্তির পক্ষে—কিন্তু তা কোনো উচ্চাসন থেকে নয়; বরং সাধারণ মানুষের প্রশ্ন নিয়ে।

প্রশ্ন দিয়ে শুরু, প্রশ্নেই অগ্রগতি

এই কথোপকথনের মূল বৈশিষ্ট্য হলো—এখানে কোনো সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া হয় না। আরজ আলী সরাসরি বলেন না যে এই বিশ্বাস ভুল বা ঐ বিশ্বাস সঠিক। বরং তিনি প্রশ্ন তোলেন। এই প্রশ্নগুলো এমনভাবে সাজানো, যাতে আগন্তুক নিজেই নিজের বিশ্বাসের ভিত নাড়িয়ে ফেলতে বাধ্য হয়।

যেমন—ধর্মীয় বিধানগুলো কীভাবে এল, কার মাধ্যমে এল, আর সেই উৎস কতটা নির্ভরযোগ্য—এই ধরনের প্রশ্ন আগন্তুকের সামনে তুলে ধরা হয়। আগন্তুক প্রথমে শাস্ত্র ও প্রচলনের দোহাই দেয়। কিন্তু আরজ আলী সেখানে থেমে থাকেন না। তিনি জানতে চান—শাস্ত্র যদি প্রশ্নাতীত হয়, তবে মানুষ কেন ব্যাখ্যা নিয়ে দ্বন্দ্বে জড়ায়?

শাস্ত্র বনাম যুক্তি

এই কথোপকথনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো শাস্ত্র ও যুক্তির সংঘাত। আগন্তুক শাস্ত্রকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে মানতে চায়। আরজ আলী সেখানে যুক্তিকে সামনে আনেন। তিনি বলেন—যে শাস্ত্র মানুষের জন্য, সেই শাস্ত্র যদি মানুষের বুদ্ধিকে অকার্যকর করে দেয়, তবে সেই শাস্ত্রের উদ্দেশ্য কী?

এই জায়গায় আরজ আলী ধর্মকে সরাসরি অস্বীকার করেন না। বরং তিনি ধর্মের ব্যাখ্যাকারীদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তিনি দেখান—ধর্মের নামে বহু কিছু প্রচলিত হয়েছে, যা আদতে ক্ষমতা ও নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার।

পাপ, পূণ্য ও ভয়ের রাজনীতি

আগন্তুকের যুক্তির একটি বড় অংশ জুড়ে থাকে পাপ-পুণ্যের ধারণা। সে মনে করে, মানুষকে নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য এই ধারণাগুলো প্রয়োজন। আরজ আলী এখানেই প্রশ্ন তোলেন—নৈতিকতা কি কেবল ভয়ের উপর দাঁড়িয়ে থাকতে পারে?

তিনি দেখান, যদি মানুষ শুধুই শাস্তির ভয়ে ভালো কাজ করে, তবে সেই ভালো কাজের মূল্য কতটুকু? আর যদি কোনো কাজ যুক্তিসংগতভাবে মানবিক হয়, তবে সেটি পাপ বলা হচ্ছে কেন?

এই অংশে কথোপকথন একটি গভীর সামাজিক বিশ্লেষণে পৌঁছে যায়। দেখা যায়—পাপ-পুণ্যের ধারণা অনেক সময় দরিদ্র ও দুর্বল মানুষের উপর চাপানো হয়, কিন্তু ক্ষমতাবানরা সেগুলো এড়িয়ে যায়।

ঈশ্বর ধারণার মুখোমুখি প্রশ্ন

আরজ আলী ও আগন্তুকের কথোপকথনের সবচেয়ে স্পর্শকাতর অংশ আসে ঈশ্বর ধারণা নিয়ে। আরজ আলী এখানে খুব সতর্ক। তিনি বলেন না যে ঈশ্বর নেই। তিনি বরং জানতে চান—ঈশ্বর সম্পর্কে আমরা যা জানি, তা কি অভিজ্ঞতা থেকে, নাকি শুনে শুনে?

তিনি যুক্তি দেন—যদি ঈশ্বর ন্যায়বান হন, তবে পৃথিবীতে এত বৈষম্য কেন? আগন্তুক এর জবাবে পরীক্ষার তত্ত্ব, পরকাল, পূর্বনির্ধারিত নিয়তির কথা তোলে। কিন্তু আরজ আলী দেখান—এই ব্যাখ্যাগুলো মানুষের দুঃখকে ন্যায্যতা দেওয়ার চেষ্টা মাত্র।

শয়তানের প্রতীকী ভূমিকা

এই গ্রন্থের শিরোনাম অনুযায়ী, শয়তান এখানে প্রতীক। শয়তান মানে অশুভ কোনো সত্তা নয়, বরং প্রশ্নকারী মন। আরজ আলী ইঙ্গিত দেন—যাকে শয়তান বলা হয়, সে আসলে প্রশ্ন করতে শেখায়। আর প্রশ্নই মানুষকে চিন্তাশীল করে তোলে।

আগন্তুক প্রথমে এই ধারণা প্রত্যাখ্যান করলেও, কথোপকথনের অগ্রগতিতে সে বুঝতে বাধ্য হয়—অন্ধ বিশ্বাসই আসলে বেশি বিপজ্জনক।

কথোপকথনের তাৎপর্য

আরজ আলী ও আগন্তুকের এই কথোপকথন কোনো বিতর্ক জয়ের জন্য নয়। এটি একটি মানসিক যাত্রা। পাঠক এখানে কোনো প্রস্তুত উত্তর পায় না, কিন্তু অসংখ্য প্রশ্ন পায়। এই প্রশ্নগুলোই গ্রন্থের শক্তি।

এই কথোপকথন আমাদের শেখায়—বিশ্বাস রাখা অপরাধ নয়, কিন্তু প্রশ্ন না করা বিপজ্জনক। সমাজকে এগিয়ে নিতে হলে প্রশ্ন করতে হয়, যুক্তি করতে হয়, আর ভয়কে পাশ কাটিয়ে চিন্তা করতে হয়।

উপসংহার

শয়তানের জবানবন্দি বইয়ে আরজ আলী ও আগন্তুকের কথোপকথন আজও প্রাসঙ্গিক, কারণ সমাজে অন্ধ বিশ্বাস, ভয় ও কর্তৃত্ববাদ এখনো শক্তভাবে বিদ্যমান। এই গ্রন্থ আমাদের শেখায়—মানুষের সবচেয়ে বড় শক্তি তার বিবেক ও যুক্তিবোধ।

আরজ আলী মাতুব্বর কোনো ধর্মপ্রচারক নন, আবার কোনো নাস্তিক ঘোষণাও দেন না। তিনি একজন প্রশ্নকারী। আর সেই প্রশ্নগুলোই আজও পাঠকের মনে আগুন জ্বালায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *