শিন্তো ধর্ম কী? জাপানের আত্মার সন্ধানে এক আদিম ভ্রমণ
জাপানকে যদি শুধু প্রযুক্তি, শৃঙ্খলা আর আধুনিকতার দেশ হিসেবে দেখা হয়, তবে তার আত্মার গভীরে প্রবেশ করা হয় না। জাপানের প্রকৃত আত্মা লুকিয়ে আছে তার প্রাচীন বিশ্বাস, লোকাচার ও প্রকৃতিনির্ভর দর্শনের মধ্যে, যার নাম শিন্তো ধর্ম। শিন্তো কোনো কঠোর ধর্মীয় কাঠামো নয়, এটি একটি জীবনদর্শন—যেখানে মানুষ, প্রকৃতি ও অদৃশ্য আত্মিক শক্তি এক সুতোয় বাঁধা। শিন্তো বোঝা মানে জাপানের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও মানসিক গঠনকে বোঝা।
শিন্তো শব্দটির অর্থই আমাদের এই যাত্রার দিকনির্দেশ দেয়। “শিন” মানে দেবতা বা আত্মা এবং “তো” মানে পথ। অর্থাৎ শিন্তো হলো “আত্মার পথ” বা “দেবতাদের পথ”। এটি কোনো একক প্রতিষ্ঠাতার ধর্ম নয়, নেই কোনো নির্দিষ্ট ধর্মগ্রন্থ বা বাধ্যতামূলক নীতিমালা। বরং এটি হাজার বছরের মানুষের অভিজ্ঞতা, প্রকৃতির প্রতি শ্রদ্ধা এবং পূর্বপুরুষদের স্মৃতির সমষ্টিগত প্রকাশ।
শিন্তো ধর্মের সবচেয়ে মৌলিক ধারণা হলো কামি। কামি বলতে শুধু দেবতা বোঝায় না। পাহাড়, নদী, বৃক্ষ, ঝড়, সূর্য, চাঁদ, এমনকি কোনো অসাধারণ মানুষ বা বীরের আত্মাও কামি হতে পারে। শিন্তো মতে, এই পৃথিবী আত্মাশূন্য নয়; প্রতিটি বস্তু ও শক্তির মধ্যেই কোনো না কোনো পবিত্র উপস্থিতি রয়েছে। এই ধারণা মানুষকে প্রকৃতির শাসক নয়, বরং প্রকৃতির অংশ হিসেবে ভাবতে শেখায়।
শিন্তোর উৎপত্তি কোনো নির্দিষ্ট তারিখে চিহ্নিত করা যায় না। এটি জন্ম নিয়েছে প্রাগৈতিহাসিক জাপানে, যখন মানুষ প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীল ছিল এবং প্রকৃতির শক্তিকে ভয় ও শ্রদ্ধা দুটোই করত। ফসল ভালো হলে তারা আনন্দিত হতো, ঝড় বা ভূমিকম্প এলে ভীত হতো। এই অনুভূতিগুলো থেকেই জন্ম নেয় বিশ্বাস—প্রকৃতির পেছনে আছে অদৃশ্য শক্তি, যাদের সন্তুষ্ট রাখতে হবে। এভাবেই ধীরে ধীরে শিন্তো বিশ্বাস গড়ে ওঠে।
পরবর্তীকালে এই বিশ্বাসগুলো লিখিত রূপ পায়। অষ্টম শতকে রচিত কোজিকি ও নিহন শোকি নামের গ্রন্থে জাপানের সৃষ্টি, দেবদেবীর জন্ম এবং সম্রাটদের ঐশ্বরিক উৎসের কাহিনি লিপিবদ্ধ হয়। এসব কাহিনিতে দেখা যায়, সূর্যদেবী আমাতেরাসু থেকে জাপানি সম্রাটদের বংশধারা এসেছে—যা শিন্তোকে শুধু ধর্ম নয়, রাষ্ট্র ও জাতীয় পরিচয়ের সঙ্গেও যুক্ত করেছে।
শিন্তো ধর্মে পাপের ধারণা পাশ্চাত্য ধর্মগুলোর মতো কেন্দ্রীয় নয়। এখানে মূল ধারণা হলো পবিত্রতা ও অপবিত্রতা। মৃত্যু, রোগ, রক্তপাত বা নেতিবাচক আচরণকে অপবিত্রতা হিসেবে ধরা হয়। তবে এই অপবিত্রতা চিরস্থায়ী নয়। শুদ্ধিকরণ আচার পালনের মাধ্যমে মানুষ আবার পবিত্র হতে পারে। এই দর্শন মানুষকে অপরাধবোধে নয়, বরং আত্মশুদ্ধির পথে এগিয়ে যেতে উৎসাহ দেয়।
শুদ্ধিকরণ শিন্তো ধর্মের দৈনন্দিন জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। শিন্তো মন্দিরে প্রবেশের আগে মানুষ হাত ও মুখ ধুয়ে নেয়। এটি শুধু শারীরিক পরিচ্ছন্নতা নয়, মানসিক প্রস্তুতিও। এর মাধ্যমে মানুষ দৈনন্দিন দুশ্চিন্তা ও অশান্তি ঝেড়ে ফেলে পবিত্র স্থানে প্রবেশ করে। এই সাধারণ কাজটিই শিন্তোর গভীর দর্শনকে প্রকাশ করে—পরিচ্ছন্নতা মানে শুধু বাহ্যিক নয়, অন্তরেরও।
শিন্তো মন্দির বা জিনজা জাপানের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত। অনেক মন্দির পাহাড়, জঙ্গল বা নদীর ধারে অবস্থিত। মন্দিরের প্রবেশপথে থাকা লাল রঙের তোরিই গেট পবিত্র ও অপবিত্র জগতের সীমারেখা নির্দেশ করে। এই গেট পেরোনোর মানেই হলো সাধারণ জগৎ ছেড়ে আত্মিক জগতে প্রবেশ করা।
শিন্তো উপাসনা অত্যন্ত সহজ ও সংক্ষিপ্ত। কোনো দীর্ঘ প্রার্থনা বা জটিল আচার নেই। সাধারণত মানুষ মন্দিরে গিয়ে নত হয়, দুইবার হাত তালি দেয় এবং কামির কাছে মনের কথা বলে। এই সরলতাই শিন্তোর শক্তি। এখানে ঈশ্বর দূরে নন, কামি মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অংশ।
শিন্তোর সবচেয়ে আনন্দময় দিক হলো তার উৎসব, যাকে বলা হয় মাতসুরি। মাতসুরি মানে শুধু ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়; এটি সামাজিক মিলনমেলা। এসব উৎসবে দেবতাদের সম্মানে শোভাযাত্রা বের হয়, নাচ-গান হয়, ঐতিহ্যবাহী খাবার পরিবেশন করা হয়। পুরো গ্রাম বা শহর একসঙ্গে আনন্দ করে। মাতসুরি দেখায়, শিন্তো ধর্ম জীবনবিমুখ নয়, বরং জীবনকে উদযাপন করে।
শিন্তো জীবনের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপের সঙ্গে জড়িত। নবজাতককে মন্দিরে নিয়ে যাওয়া হয় আশীর্বাদের জন্য। নতুন বাড়ি বা ব্যবসা শুরু করার আগে শুদ্ধিকরণ করা হয়। এমনকি বিয়ের ক্ষেত্রেও শিন্তো আচার প্রচলিত। যদিও মৃত্যু শিন্তোতে অপবিত্রতার সঙ্গে যুক্ত, তাই অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সাধারণত বৌদ্ধ রীতিতে করা হয়। এই সহাবস্থানই জাপানের ধর্মীয় সংস্কৃতির বৈশিষ্ট্য।
ষষ্ঠ শতকে জাপানে বৌদ্ধধর্ম প্রবেশের পর শিন্তো বিলুপ্ত হয়নি; বরং দুটো ধর্ম একসঙ্গে বিকশিত হয়েছে। শত শত বছর ধরে শিন্তো ও বৌদ্ধ বিশ্বাস একে অপরের সঙ্গে মিশে গেছে। অনেক মন্দিরে শিন্তো ও বৌদ্ধ উপাদান পাশাপাশি দেখা যায়। এই ধর্মীয় সহনশীলতা জাপানি সমাজকে একটি অনন্য চরিত্র দিয়েছে।
আধুনিক জাপানে অনেক মানুষ নিজেদের ধার্মিক বলে মনে করে না, তবুও শিন্তো তাদের জীবনের অংশ। নববর্ষে মন্দিরে যাওয়া, পরীক্ষার আগে সৌভাগ্যের জন্য প্রার্থনা করা, উৎসবে অংশ নেওয়া—এসবই শিন্তো সংস্কৃতির প্রকাশ। শিন্তো আজ একটি ধর্মের চেয়ে বেশি—এটি একটি সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার।
শিন্তো ধর্ম আমাদের শেখায় প্রকৃতির সঙ্গে যুদ্ধ নয়, সহাবস্থান। আধুনিক বিশ্বের পরিবেশ সংকটের প্রেক্ষাপটে এই দর্শন অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। যেখানে শিন্তো বলে—পাহাড় দেবতা, নদী পবিত্র, গাছের আত্মা আছে—সেখানে প্রকৃতির ধ্বংস মানে শুধু পরিবেশ নয়, আত্মিক ভারসাম্যেরও ক্ষতি।
জাপানের আত্মার সন্ধানে শিন্তো একটি আদিম কিন্তু জীবন্ত ভ্রমণ। এটি আমাদের আধুনিক চিন্তার বাইরে নিয়ে যায়, যেখানে জীবনকে শুধু ভোগের বস্তু নয়, পবিত্র উপহার হিসেবে দেখা হয়। শিন্তো ধর্ম মনে করিয়ে দেয়, আমরা একা নই—আমাদের চারপাশের প্রতিটি সত্তার সঙ্গে আমরা অদৃশ্যভাবে যুক্ত।
শেষ পর্যন্ত বলা যায়, শিন্তো ধর্ম বোঝা মানে কোনো নির্দিষ্ট বিশ্বাসে আবদ্ধ হওয়া নয়। এটি এক ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি, যেখানে কৃতজ্ঞতা, সম্মান ও সামঞ্জস্যই সবচেয়ে বড় প্রার্থনা। জাপানের আত্মার গভীরে যে শান্ত, নীরব শক্তি প্রবাহিত—শিন্তোই তার নাম।
