অকামের রেজর (Occam’s Razor): অন্ধবিশ্বাস দূর করার সহজ হাতিয়ার।

অকামের রেজর (Occam’s Razor): অন্ধবিশ্বাস দূর করার সহজ হাতিয়ার।
অকামের রেজর (Occam’s Razor): অন্ধবিশ্বাস দূর করার সহজ হাতিয়ার।

মানুষের মন খুব সহজেই নানা ঘটনার মধ্যে সম্পর্ক খুঁজে পায়। সামান্য মিল দেখলেই আমরা ধরে নিই—এর পেছনে নিশ্চয়ই কোনো গভীর বা রহস্যময় কারণ আছে। প্রাচীনকালে মানুষ বজ্রপাতকে দেবতার রাগ, ভূমিকম্পকে দেবতার শাস্তি বা শিশুর হঠাৎ মৃত্যুকে অশুভ শক্তির কাজ বলে ভাবত। কিন্তু আজ আমরা জানি, এগুলোর পেছনে রয়েছে বিজ্ঞানসম্মত কারণ—বিদ্যুৎ, ভূতাত্ত্বিক পরিবর্তন, রোগ বা জেনেটিক সমস্যা।

সমস্যা হয় তখনই, যখন সহজ ও প্রাকৃতিক ব্যাখ্যা থাকা সত্ত্বেও আমরা অপ্রয়োজনীয় কল্পিত শক্তি—যেমন দেবতা, ভূত, জিন, অলৌকিক শক্তি বা গোপন ষড়যন্ত্র—ঢুকিয়ে দিই। এই জায়গায় আমাদের সাহায্য করে একটি গুরুত্বপূর্ণ যুক্তিগত নীতি, যার নাম অকামের রেজর

অকামের রেজর কী?

সহজ কথায়, অকামের রেজর বলে—
একটি ঘটনার যদি একাধিক ব্যাখ্যা থাকে, তবে যে ব্যাখ্যায় সবচেয়ে কম অনুমান দরকার, সেটিই আগে গ্রহণ করা উচিত।

এর মানে এই নয় যে সবচেয়ে সহজ ব্যাখ্যাই সব সময় সত্য। বরং এর অর্থ হলো—অকারণে জটিল, অলৌকিক বা অপ্রমাণিত বিষয় যোগ না করে আগে সহজ ও বাস্তব ব্যাখ্যাগুলো যাচাই করা উচিত।

এটিকে “রেজর” বলা হয়, কারণ এটি যুক্তির ধারালো ব্লেডের মতো অপ্রয়োজনীয় কল্পনা আর বাড়তি ধারণাগুলো কেটে ফেলে।

ইতিহাস ও ভাবনার পটভূমি

এই নীতির নামকরণ হয়েছে ইংরেজ দার্শনিক উইলিয়াম অব অকাম-এর নামে (১৩শ–১৪শ শতক)। তিনি নিজে ধর্মপ্রাণ ছিলেন, কিন্তু দর্শন ও যুক্তিতে অকারণে জটিল ধারণা আনার বিরোধিতা করতেন। তার আগেও অ্যারিস্টটল বা থমাস অ্যাকুইনাস সরলতার গুরুত্বের কথা বলেছেন।

আধুনিক বিজ্ঞানে নিউটন, আইনস্টাইন বা ফাইনম্যানের মতো বিজ্ঞানীরাও এমন তত্ত্বই পছন্দ করেছেন, যা কম অনুমানে বেশি ব্যাখ্যা দিতে পারে। কার্ল সেগান বলেছেন, সরল ও সমালোচনামূলক চিন্তা আমাদের কুসংস্কার থেকে বাঁচায়।

একটি সহজ উদাহরণ

ধরুন সকালে উঠে দেখলেন, বারান্দার একটি টব ভেঙে নিচে পড়ে আছে।

ব্যাখ্যা A: রাতে ঝোড়ো হাওয়া লেগেছে বা কোনো বিড়াল টব ফেলে দিয়েছে।
ব্যাখ্যা B: ভিনগ্রহের এলিয়েন এসে লেজার পরীক্ষা করতে গিয়ে টব ভেঙে ফেলেছে।

অকামের রেজর বলবে—A-ই বেশি যুক্তিযুক্ত। কারণ বাতাস, বিড়াল আর মাধ্যাকর্ষণ বাস্তব ও পরিচিত। কিন্তু B মানতে হলে এলিয়েন, তাদের যন্ত্র, পৃথিবীতে আসা—এসব অনেক অপ্রমাণিত ধারণা যোগ করতে হয়। যখন A-ই যথেষ্ট, তখন B ধরার দরকার নেই।

দৈনন্দিন জীবনে অকামের রেজর

এই নীতি শুধু দার্শনিকদের জন্য নয়, আমাদের প্রতিদিনের জীবনেও কাজে লাগে।

  • মোবাইল হারিয়ে গেলে:
    সহজ ব্যাখ্যা—কোথাও রেখে ভুলে গেছেন।
    জটিল ব্যাখ্যা—অদৃশ্য জিন চুরি করেছে।
  • রাতে দরজায় শব্দ হলে:
    বাতাস, কাঠের প্রসারণ বা চাপ—এসব যথেষ্ট ব্যাখ্যা।
    ভূতের গল্প অপ্রয়োজনীয়।
  • জ্যোতিষ বা হাতের রেখা:
    জীবনের ঘটনাগুলো সিদ্ধান্ত, পরিবেশ, পরিশ্রম ও সুযোগ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায়। গ্রহদেবতা যোগ করা বাড়তি অনুমান।

বিজ্ঞান ও অতিপ্রাকৃত ব্যাখ্যা

বিজ্ঞানের ইতিহাস মূলত অতিপ্রাকৃত ব্যাখ্যা বাদ দিয়ে প্রাকৃতিক ব্যাখ্যা খোঁজার ইতিহাস।

  • মহাবিশ্বের সৃষ্টি:
    অনেকে বলেন, সব কিছুর পেছনে একজন স্রষ্টা আছেন। কিন্তু এতে প্রশ্ন আসে—স্রষ্টাকে কে সৃষ্টি করল? আধুনিক কসমোলজি বিগ ব্যাং ও পদার্থবিজ্ঞানের নিয়ম দিয়ে ব্যাখ্যা দেয়, যেখানে অতিপ্রাকৃত সত্তা দরকার হয় না।
  • বিবর্তন:
    জীবনের বৈচিত্র্য প্রাকৃতিক নির্বাচন ও জিনগত পরিবর্তনে বোঝানো যায়। আলাদা কোনো অদৃশ্য ডিজাইনার ধরা অপ্রয়োজনীয়।
  • অলৌকিক চিকিৎসা:
    অনেক রোগ সেরে ওঠে চিকিৎসা, শরীরের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বা প্লাসিবো প্রভাবের কারণে। প্রার্থনার অলৌকিক শক্তি যোগ করা বাড়তি অনুমান।
  • মানসিক রোগ:
    এপিলেপসি বা স্কিজোফ্রেনিয়ার কারণ মস্তিষ্ক ও রাসায়নিক ভারসাম্যহীনতা। জিনে ধরার ধারণা রোগীর ক্ষতি করে।

কুসংস্কার ও ষড়যন্ত্র তত্ত্ব

অকামের রেজর কুসংস্কার বুঝতেও সাহায্য করে।

  • হোমিওপ্যাথি:
    পানির “স্মৃতি” বা জাদুকরি ধারণার কোনো প্রমাণ নেই। প্লাসিবো ও স্বাভাবিক আরোগ্যই যথেষ্ট ব্যাখ্যা।
  • নজর বা তাবিজ:
    অসুখের কারণ সাধারণত জীবাণু বা স্বাস্থ্যগত সমস্যা। নজর লাগা ধরে নেওয়া অপ্রয়োজনীয়।
  • ষড়যন্ত্র তত্ত্ব:
    বড় দুর্ঘটনা বা ঘটনা অনেক সময় ভুল, অব্যবস্থা বা মানবিক দুর্বলতার ফল। সবকিছুর পেছনে গোপন শক্তি কল্পনা করা বাস্তবসম্মত নয়।

অকামের রেজর নিয়ে ভুল ধারণা

  • এটি বলে না যে সহজ মানেই সত্য।
  • এটি জটিল তত্ত্বকে বাতিল করে না, যদি প্রমাণ থাকে।
  • এটি ঈশ্বরের অস্তিত্ব অস্বীকার করে না; শুধু অপ্রয়োজনীয় ধারণা বাদ দিতে বলে।
  • “যা বুঝি না তা মিথ্যা”—এমন কথাও বলে না।

God of the Gaps ভাবনা

অনেক সময় আমরা যেটা জানি না, সেখানেই ঈশ্বর বা অলৌকিক শক্তি বসিয়ে দিই। একে বলা হয় “God of the gaps”। কিন্তু জ্ঞান বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই ফাঁকগুলো ভরে যায়। অকামের রেজর আমাদের শেখায়—“আমি জানি না” বলা খারাপ নয়; বরং সেটাই নতুন জ্ঞান খোঁজার শুরু।

উপসংহার

অকামের রেজর আমাদের মনে করিয়ে দেয়—সব কিছুর পেছনে রহস্য বা অলৌকিকতা খোঁজার দরকার নেই। সহজ, প্রাকৃতিক ও প্রমাণভিত্তিক ব্যাখ্যা দিয়েই অনেক প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায়। অন্ধবিশ্বাস, কুসংস্কার আর অযথা ভয়ের জঞ্জাল পরিষ্কার করতে এই নীতিটি সত্যিই একটি শক্তিশালী ও দরকারি হাতিয়ার।

1 Response

  1. Sojib says:

    এগুলো আল্লাহর ইচ্ছায় হয় 😡👿 মাদার চুদ, নাস্তিক। বেঁচেআস্ত, তুই দেশে নাই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *