জেনেভা কনভেনশনের নিয়ম—যুদ্ধের সময় মানবতা রক্ষা। পার্ট ২।

জেনেভা কনভেনশনের নিয়ম—যুদ্ধের সময় মানবতা রক্ষা
জেনেভা কনভেনশনের নিয়ম—যুদ্ধের সময় মানবতা রক্ষা

পার্ট ১-এ আমরা জেনেছি জেনেভা কনভেনশনের শুরু সম্পর্কে এবং কীভাবে ১৯শ শতকে হেনরি ডুনান্ট ও আন্তর্জাতিক রেড ক্রসের মাধ্যমে এর জন্ম হয়। এখন পার্ট ২-এ আমরা জেনেভা কনভেনশনের নিয়মগুলো এবং এগুলোর অর্থ কী তা দেখব।

চারটি প্রধান জেনেভা কনভেনশন (১৯৪৯)

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পৃথিবী ভয়াবহ কষ্ট দেখেছিল। লক্ষ লক্ষ সৈনিক ও সাধারণ মানুষ নিহত হয়, নির্যাতিত হয় বা ঘরছাড়া হয়। তখন বিশ্বনেতারা বুঝলেন, যুদ্ধের সময় মানুষকে রক্ষা করার জন্য আরও শক্ত ও স্পষ্ট আইন দরকার। তাই ১৯৪৯ সালে চারটি নতুন জেনেভা কনভেনশন স্বাক্ষরিত হয়। আজও এগুলো মানবিক আইনের ভিত্তি।

চারটি চুক্তি সহজভাবে নিচে দেওয়া হলো:

প্রথম জেনেভা কনভেনশন:
যুদ্ধক্ষেত্রে আহত ও অসুস্থ সৈনিকদের রক্ষা করে। তাদের চিকিৎসা দিতে হবে এবং হাসপাতালের ওপর হামলা করা যাবে না।

দ্বিতীয় জেনেভা কনভেনশন:
সমুদ্রে আহত, অসুস্থ ও জাহাজডুবিতে পড়া সৈনিকদের রক্ষা করে। যারা তাদের উদ্ধার করে, সেই জাহাজগুলোতে হামলা করা যাবে না।

তৃতীয় জেনেভা কনভেনশন:
যুদ্ধবন্দিদের (POW) রক্ষা করে। তাদের ন্যায্য আচরণ করতে হবে, নির্যাতন করা যাবে না এবং পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে দিতে হবে।

চতুর্থ জেনেভা কনভেনশন:
যুদ্ধের সময় সাধারণ মানুষকে রক্ষা করে। তাদের ওপর হামলা করা যাবে না, অনাহারে রাখা যাবে না বা অকারণে ঘরছাড়া করা যাবে না।

অতিরিক্ত প্রোটোকল

পরে ১৯৭৭ ও ২০০৫ সালে “অতিরিক্ত প্রোটোকল” নামে আরও কিছু চুক্তি যোগ হয়। এগুলো আধুনিক যুদ্ধ—যেমন গৃহযুদ্ধ ও নতুন অস্ত্রের ব্যবহার—এই সব বিষয় কভার করে।

সহজ ভাষায় গুরুত্বপূর্ণ নিয়ম

জেনেভা কনভেনশনে অনেক নিয়ম আছে, তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণগুলো হলো:

  • আহত ও অসুস্থ সবাইকে সম্মানের সঙ্গে আচরণ করতে হবে, তারা যে পক্ষেরই হোক।
  • যুদ্ধবন্দিদের ওপর নির্যাতন বা খারাপ ব্যবহার করা যাবে না।
  • নারী, শিশু ও বয়স্কদের মতো সাধারণ মানুষের ওপর হামলা করা যাবে না।
  • হাসপাতাল, স্কুল বা ত্রাণকর্মীদের ওপর হামলা করা যাবে না।
  • রেড ক্রস ও রেড ক্রিসেন্ট চিহ্ন সঠিকভাবে ব্যবহার করতে হবে—এগুলো সুরক্ষার চিহ্ন, লক্ষ্য নয়।
  • বন্দিদের খাবার, পানি, আশ্রয় ও চিকিৎসা দিতে হবে।
  • জিম্মি করা যাবে না।
  • অপ্রয়োজনীয় কষ্ট সৃষ্টি করা অস্ত্র ব্যবহার করা যাবে না।

এই নিয়মগুলো কেন গুরুত্বপূর্ণ?

যুদ্ধ নিষ্ঠুর, কিন্তু এই নিয়মগুলো সীমা তৈরি করে। এগুলো না থাকলে যুদ্ধ হতো সীমাহীন হত্যাযজ্ঞ। জেনেভা কনভেনশন একটি নৈতিক দিকনির্দেশনা, যা মনে করিয়ে দেয়—যুদ্ধের মধ্যেও মানবজীবনের মূল্য আছে।

উদাহরণ হিসেবে:

  • কোনো সৈনিক আহত হলে সে আর শত্রু নয়, সে একজন রোগী।
  • কাউকে বন্দি করা হলে, তাকে মানুষ হিসেবে সম্মান করতে হবে, প্রতিশোধের বস্তু হিসেবে নয়।
  • যুদ্ধ এলাকায় আটকে পড়া সাধারণ মানুষকে রক্ষা করতে হবে এবং খাবার ও চিকিৎসা দিতে হবে।

সব দেশ কি জেনেভা কনভেনশন মানে?

পৃথিবীর প্রায় সব দেশ (১৯৬টি) জেনেভা কনভেনশনে সই করেছে। তাই এটি বিশ্বের সবচেয়ে বেশি স্বীকৃত চুক্তিগুলোর একটি।

তবে বাস্তবে কিছু সরকার বা গোষ্ঠী নিয়ম ভাঙে। তখন আন্তর্জাতিক রেড ক্রস ও আন্তর্জাতিক সমাজ তাদের জবাবদিহির আওতায় আনার চেষ্টা করে। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (ICC)-এর মতো যুদ্ধাপরাধ বিচার জেনেভা কনভেনশনের আইনের ওপর ভিত্তি করে হয়।

সুরক্ষার উদাহরণ

  • যুদ্ধের সময় রেড ক্রস কর্মীরা সাহায্য পৌঁছাতে যুদ্ধক্ষেত্রে যেতে পারেন, কারণ তারা সুরক্ষিত।
  • এই নিয়মের কারণে অনেক সময় দেশগুলোর মধ্যে যুদ্ধবন্দিদের নিরাপদে বিনিময় হয়।
  • সংঘাতপূর্ণ এলাকায় শরণার্থী ও সাধারণ মানুষ খাবার, ওষুধ ও আশ্রয় পায়।

আজকের চ্যালেঞ্জ

আজকের যুদ্ধ আগের মতো নয়। অনেক সংঘাতে রাষ্ট্রের পাশাপাশি সশস্ত্র গোষ্ঠী, বিদ্রোহী বা সন্ত্রাসীরা জড়িত। তারা সব সময় জেনেভা কনভেনশন মানে না। কেউ কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে সাধারণ মানুষ বা হাসপাতালের ওপর হামলা করে।

এতে নিয়ম মানানো কঠিন হয়, কিন্তু জেনেভা কনভেনশনের মূল আদর্শ আজও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

পার্ট ২-এর শেষ কথা

জেনেভা কনভেনশন শুধু আইন নয়। এগুলো অন্ধকার সময়ে মানবতার প্রতিশ্রুতি। এগুলো বলে—যুদ্ধ চললেও করুণা, মর্যাদা ও জীবনের প্রতি সম্মান ভুলে যাওয়া যাবে না।

এই নিয়মগুলো না থাকলে যুদ্ধ হতো শুধু বিশৃঙ্খলা আর নিষ্ঠুরতা। জেনেভা কনভেনশনের কারণে ইতিহাস জুড়ে লক্ষ লক্ষ সৈনিক, বন্দি ও সাধারণ মানুষ সুরক্ষা পেয়েছে।

এগুলো আমাদের একটি সহজ সত্য মনে করিয়ে দেয়: মানুষ হওয়ার মানে হলো—যুদ্ধের মধ্যেও একে অপরের যত্ন নেওয়া।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *