মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনী সিরিজ — পর্ব ৯
আরবের ঐক্য, শেষ ভাষণ এবং মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনের শেষ অধ্যায়।
মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনের শেষ অধ্যায় তাঁর সংগ্রামের সমাপ্তি নয়; বরং তাঁর গড়ে তোলা সমাজের পূর্ণতার অধ্যায়। মক্কা বিজয়ের পর আরব উপদ্বীপের রাজনৈতিক বাস্তবতা দ্রুত পরিবর্তিত হতে শুরু করে। বহু বছরের বিরোধ, যুদ্ধ ও গোত্রীয় সংঘাতের পর ধীরে ধীরে এমন এক পরিবেশ তৈরি হয় যেখানে বিভিন্ন গোত্র নতুন বাস্তবতাকে গ্রহণ করতে শুরু করে।
একসময় যে আরব ছিল শত শত স্বাধীন গোত্রে বিভক্ত, সেখানে এখন একটি বৃহত্তর সামাজিক ও রাজনৈতিক ঐক্যের ধারণা প্রতিষ্ঠিত হচ্ছিল। এই পরিবর্তন ছিল দীর্ঘ প্রক্রিয়ার ফল। এতে ছিল কূটনীতি, সমঝোতা, সামাজিক সংস্কার, ধর্মীয় শিক্ষা এবং নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা।
আরবের পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতা।
মক্কা বিজয়ের পর অনেক গোত্র বুঝতে পারে যে পুরোনো শক্তির ভারসাম্য বদলে গেছে। মদিনা আর একটি ছোট শহর নয়; এটি আরবের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক কেন্দ্র। ফলে বিভিন্ন অঞ্চল থেকে প্রতিনিধি এসে সম্পর্ক স্থাপন করতে থাকে।
কেউ ইসলাম গ্রহণ করে, কেউ রাজনৈতিক মিত্রতা গড়ে তোলে, আবার কেউ শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের পথ বেছে নেয়। এই সময়ে সংঘাতের তুলনায় আলোচনার গুরুত্ব বেড়ে যায়। মুহাম্মদ (সা.)-এর নেতৃত্বে গোত্রভিত্তিক বিভাজনের পরিবর্তে একটি বৃহত্তর সম্প্রদায়ের ধারণা—উম্মাহ—আরও সুদৃঢ় হতে থাকে।
প্রশাসন ও সমাজগঠন।
যুদ্ধের তীব্রতা কমে এলে সমাজ পরিচালনার প্রশ্ন সামনে আসে। বিভিন্ন অঞ্চলে প্রতিনিধি নিয়োগ, যাকাত ব্যবস্থার তদারকি, বিরোধ নিষ্পত্তি এবং স্থানীয় নেতৃত্বের সঙ্গে সমন্বয়—এসব বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
এই পর্যায়ে তাঁর ভূমিকা একজন ধর্মীয় প্রচারকের সীমা ছাড়িয়ে একজন সমাজসংগঠক ও রাষ্ট্রনির্মাতার রূপ পায়। বিভিন্ন গোত্রের মধ্যে শান্তি বজায় রাখা, ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা এবং নতুন সম্প্রদায়কে সুসংহত করা ছিল তাঁর অন্যতম প্রধান দায়িত্ব।
আরবের বৃহৎ অংশের ঐক্য।
ঐতিহাসিকভাবে এই সময়কে আরব উপদ্বীপে একটি বড় পরিবর্তনের সময় হিসেবে দেখা হয়। বহু গোত্র, যারা আগে পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল, ধীরে ধীরে একই বৃহত্তর রাজনৈতিক ও ধর্মীয় কাঠামোর সঙ্গে নিজেদের যুক্ত করে।
এই ঐক্য কেবল সামরিক শক্তির ফল ছিল না। বরং দীর্ঘ আলোচনার সংস্কৃতি, চুক্তি, পারস্পরিক দায়িত্ববোধ এবং নতুন সামাজিক পরিচয় গঠনের মধ্য দিয়ে এটি বিকশিত হয়।
বিদায় হজ ও ভাষণ।
বিদায় হজের ভাষণ (খুতবাতুল বিদা) হলো মহানবী Muhammad (সা.)-এর শেষ হজের সময় প্রদত্ত ঐতিহাসিক ভাষণ। এটি ১০ হিজরি (৬৩২ খ্রিস্টাব্দ) সালে আরাফাতের ময়দানে প্রদান করা হয়। এই ভাষণের বিভিন্ন অংশ বিভিন্ন হাদিসগ্রন্থে সংরক্ষিত আছে; একটি একক পূর্ণাঙ্গ “অফিশিয়াল” সংস্করণ নেই। তাই আজ যে দীর্ঘ “বিদায় হজের ভাষণ” প্রচলিত, তার অনেক অংশ বিভিন্ন বর্ণনা একত্র করে সাজানো হয়েছে।
এর মূল বিষয়গুলো ছিল:
- জীবন, সম্পদ ও সম্মানের পবিত্রতা
- তিনি বলেন, যেমন এই দিন, এই মাস ও এই নগর পবিত্র, তেমনি একজন মুসলিমের জীবন, সম্পদ ও সম্মানও পবিত্র। কারও ওপর অন্যায় করা যাবে না।
- সুদ (রিবা) বিলুপ্ত ঘোষণা
- জাহেলি যুগের সব সুদ বাতিল করা হয়। তিনি নিজের পরিবারের দাবিকৃত সুদও প্রথমে বাতিল ঘোষণা করেন, যাতে বোঝা যায় আইন সবার জন্য সমান।
- রক্তের প্রতিশোধের প্রথা বন্ধ
- গোত্রীয় প্রতিশোধ ও জাহেলি যুগের রক্তঋণের প্রথা বাতিল ঘোষণা করেন।
- নারীদের অধিকার
- তিনি পুরুষদের নারীদের সঙ্গে সদ্ব্যবহার করতে বলেন এবং স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক অধিকার ও দায়িত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দেন।
- মুসলিম ভ্রাতৃত্ব
- সব মুসলিম পরস্পরের ভাই। কারও সম্পদ তার স্বতঃস্ফূর্ত সম্মতি ছাড়া গ্রহণ করা বৈধ নয়।
- সমতা ও মানব মর্যাদা
- তিনি বলেন, কোনো আরবের ওপর অনারবের, বা অনারবের ওপর আরবের, কোনো শ্বেতাঙ্গের ওপর কৃষ্ণাঙ্গের, বা কৃষ্ণাঙ্গের ওপর শ্বেতাঙ্গের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই—শুধু তাকওয়া (আল্লাহভীতি ও নৈতিকতা) ব্যতীত। এই বক্তব্য ইসলামে মানবসমতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা হিসেবে বিবেচিত হয়।
- কুরআন ও সুন্নাহর অনুসরণ
- তিনি মুসলিমদের আল্লাহর কিতাব আঁকড়ে ধরার নির্দেশ দেন। বিভিন্ন বর্ণনায় “কুরআন ও সুন্নাহ” অথবা “কুরআন ও আমার আহলে বাইত”—উভয় ধরনের শব্দ এসেছে, যা বিভিন্ন হাদিস-ঐতিহ্যে সংরক্ষিত রয়েছে।
- বার্তা পৌঁছে দেওয়ার নির্দেশ
- তিনি উপস্থিত সাহাবিদের বলেন, যারা উপস্থিত আছে তারা যেন অনুপস্থিতদের কাছে এই বার্তা পৌঁছে দেয়।
শেষ অসুস্থতা ও মৃত্যুর মুহূর্ত।
১০ হিজরিতে বিদায় হজ সম্পন্ন করার কয়েক মাস পর, ১১ হিজরির সফর মাসের শেষ দিকে (৬৩২ খ্রিস্টাব্দ) তিনি অসুস্থ হন। তাঁর প্রধান উপসর্গ ছিল:
- তীব্র জ্বর।
- মাথাব্যথা।
- দুর্বলতা।
প্রথমে তিনি তাঁর স্ত্রীদের ঘরে পালাক্রমে অবস্থান করছিলেন। পরে অসুস্থতা বেড়ে গেলে তিনি অনুমতি নিয়ে স্ত্রী Aisha (রা.)-এর ঘরে চলে আসেন, যেখানে তিনি শেষ দিনগুলো কাটান। অসুস্থতার মধ্যেও তিনি মুসলিম সমাজের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর প্রতি মনোযোগ দেন।
তিনি বলেন:
- নামাজের প্রতি যত্নবান হতে।
- দাস-দাসীদের সঙ্গে সদ্ব্যবহার করতে।
- মুসলিমদের মধ্যে ঐক্য বজায় রাখতে।
একদিন শারীরিক অবস্থার সাময়িক উন্নতি হলে তিনি মসজিদে এসে সাহাবিদের উদ্দেশে বক্তব্য দেন। তবে পরে অসুস্থতা আবার বেড়ে যায়।
অসুস্থতার কারণে তিনি নিজে নামাজ পরিচালনা করতে পারছিলেন না। তখন তিনি নির্দেশ দেন যে Abu Bakr (রা.) যেন মুসল্লিদের ইমামতি করেন। ইসলামের ইতিহাসে এই ঘটনাকে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হয়।
মৃত্যুর মুহূর্ত।
তিনি Aisha (রা.)-এর ঘরেই ছিলেন। আয়িশা (রা.) বর্ণনা করেন যে, ইন্তেকালের সময় মুহাম্মদ (সা.) তাঁর মাথা তাঁর কোলে ছিল। এরপর তিনি ইন্তেকাল করেন।
এটি ছিল:
- তারিখ: ১২ রবিউল আউয়াল, ১১ হিজরি (এই তারিখ নিয়ে কিছু ঐতিহাসিক মতভেদ আছে, তবে এটিই সর্বাধিক প্রচলিত মত)।
- বার: সোমবার।
- বয়স: প্রায় ৬৩ বছর।
সূত্র সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত নোটঃ এই সিরিজের প্রধান উৎস: The First Muslim
লেখক Lesley Hazleton বইটিতে মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনকে একজন ইতিহাস বিশ্লেষক ও গল্পকারের দৃষ্টিতে উপস্থাপন করেছেন। অর্থাৎ, এটি শুধু ধর্মীয় বর্ণনা নয়; বরং সেই সময়ের আরব সমাজ, রাজনীতি, সংস্কৃতি এবং মানুষের মানসিক অবস্থাকেও তুলে ধরা হয়েছে।
